মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্টে পাইথন কেন ব্যবহার করা হয় না?

আজ পাইথন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, অটোমেশন এবং সাইবার সিকিউরিটির জগতে এক বিশাল শক্তির নাম। কিন্তু এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে পাইথনের উপস্থিতি প্রায় হারিয়ে যাওয়া—মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট

কিন্তু জানেন কি? এমন এক সময় ছিল, যখন পাইথন চাইলে মোবাইল অ্যাপের রাজা হয়ে যেতে পারত—এমনকি আইফোন এবং অ্যান্ড্রয়েড আসারও আগে।

তাহলে প্রশ্ন হলো—কী হয়েছিল? কেন এত শক্তিশালী একটি প্রোগ্রামিং ভাষা মোবাইল দুনিয়া থেকে প্রায় হারিয়ে গেল?

নোকিয়ার সোনালী যুগ এবং পাইথনের শুরু

চলুন ফিরে যাই ২০০৫ সালে। তখনকার সময়ে স্মার্টফোন মানেই ছিল নোকিয়া। মোবাইল বাজারে তাদের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। আর সেই সময়েই নোকিয়ার Symbian S60 ফোনের জন্য ছিল PIS60 (Python for S60) নামে একটি পাইথন ইন্টারপ্রেটার।

শুনতে অবাক লাগলেও, সেই সময় মানুষ সরাসরি মোবাইলেই পাইথন স্ক্রিপ্ট রান করতে পারত। ছোটখাটো গেম তৈরি করা যেত, বিভিন্ন কাজ অটোমেট করা যেত, এমনকি মোবাইলকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজও করা সম্ভব ছিল।

সহজভাবে বললে, পাইথন তখন থেকেই মোবাইল দুনিয়ায় নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করেছিল

কিন্তু তারপরই আসে এক বিশাল পরিবর্তন।

২০০৭ সালে অ্যাপল আইফোন উন্মোচন করে।

প্রযুক্তি বিশ্বের চিত্র দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। পুরোনো মোবাইল ইকোসিস্টেম ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে, নোকিয়ার আধিপত্য কমতে থাকে, আর তার সাথে সাথে মোবাইল অ্যাপের জগতে পাইথনের সবচেয়ে বড় সুযোগটিও হারিয়ে যেতে থাকে

অ্যান্ড্রয়েডে পাইথনের দ্বিতীয় সুযোগ

তবে গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

২০০৯ সালে গুগল যখন অ্যান্ড্রয়েড তৈরি করছিল, তখন তারা প্রোগ্রামিং ভাষা হিসেবে পাইথনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছিল। গুগল এমনকি SL4A (Scripting Layer for Android) নামে একটি সিস্টেম চালু করেছিল, যার মাধ্যমে ডেভেলপাররা পাইথন ব্যবহার করে অ্যান্ড্রয়েড স্ক্রিপ্ট লিখতে পারতেন।

অর্থাৎ, পাইথনের সামনে আরেকটি বড় সুযোগ এসেছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুগল একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়—তারা Java-কে বেছে নেয়।

কারণ, Java ছিল দ্রুত, স্থিতিশীল এবং বড় পরিসরে আগেই পরীক্ষিত। অন্যদিকে পাইথনকে তুলনামূলক ধীরগতির হিসেবে দেখা হতো। ফলে ধীরে ধীরে পাইথন অ্যান্ড্রয়েডের মূলধারা থেকে সরে যেতে থাকে।

অ্যাপলের কঠোর অবস্থান

অন্যদিকে, অ্যাপল আরও কঠোর অবস্থান নেয়।

অ্যাপলের লক্ষ্য ছিল এমন একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে অ্যাপগুলো হবে দ্রুত, নিয়ন্ত্রিত এবং ভালোভাবে অপ্টিমাইজড। এই কারণেই তারা Objective-C এবং পরবর্তীতে Swift-কে প্রাধান্য দেয়।

পাইথনের মতো interpreted programming language অ্যাপলের কঠোর নিয়মের সাথে খুব একটা মানানসই ছিল না। ফলাফল হিসেবে, iOS-এ পাইথনের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে

আজও iPhone-এ পূর্ণাঙ্গ Python অ্যাপ তৈরি এবং চালানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পাইথনকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা

তারপরও পাইথনকে মোবাইলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা থেমে থাকেনি।

Kivy এবং PyQt-এর মতো বিভিন্ন framework তৈরি হয়েছিল, যেগুলোর লক্ষ্য ছিল পাইথন দিয়ে মোবাইল অ্যাপ তৈরি সহজ করা।

কিন্তু ততদিনে বাজারে চলে এসেছে React Native এবং Flutter-এর মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। উন্নত UI, ভালো performance এবং business-ready ecosystem-এর কারণে পাইথনের framework-গুলো পিছিয়ে পড়ে।

তাহলে কি পাইথন হেরে গেছে?

উত্তর হলো—না

পাইথন হয়তো মোবাইল অ্যাপের যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি, কিন্তু সে আরও বড় একটি যুদ্ধ জিতে নিয়েছে।

আজ AI, Machine Learning, Backend Development, Cybersecurity এবং Automation-এর জগতে পাইথনের আধিপত্য স্পষ্ট।

অর্থাৎ, পাইথন মোবাইল অ্যাপের রাজা হতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সম্রাটে পরিণত হয়েছে

কখনো কখনো, একটি যুদ্ধ হারলেও পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ী হওয়া যায়

About the author

MD Zakaria Hossen
Together Toward Eternity

Post a Comment